শেরপুর প্রতিনিধিঃ
শেরপুরের গারো পাহাড়ে তিন দশক ধরে চলা মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত যেন থামছেই না। উপুর্যুপরি বন্যহাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে পাহাড়ি গ্রামবাসীরা। নেয়া হচ্ছে, একের পর এক প্রকল্প, কোটি কোটি টাকা ব্যয়, সৌরবিদ্যুৎচালিত বেড়া (সোলার ফেন্সিং), এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন এবং হাতির উপযোগী খাদ্যগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল। বরং হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যু, ফসলহানি ও বসতবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মানুষের পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদসহ নানা কারণে প্রাণ হারাচ্ছে বন্যহাতিও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সাল থেকে মানুষ-হাতির সংঘাতের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরে নেই। তবে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত মানুষ-হাতির সংঘাতে ২৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রাণ গেছে ৩০টি হাতির। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, গারো পাহাড়ে বর্তমানে ১৩৫ থেকে ১৪০টি বন্যহাতি অবস্থান করছে।
মধুটিলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকায় বন্যহাতির দল ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে হাতিগুলো এ দেশেই অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে এবার হাতির অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তদেশীয় হাতি চলাচলের করিডর তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত ১০ অক্টোবর মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে জেলা প্রশাসন ও ময়মনসিংহ বন বিভাগের উদ্যোগে ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আবদুল আউয়াল পিন্টু। জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বন বিভাগের কর্মকর্তা ও হাতি সংরক্ষণবিষয়ক প্রাণিবিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে আগের উদ্যোগগুলোর মতো নতুন পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের অভাবে ব্যর্থ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয়দের।
তিন দশকের সংঘাত, আতঙ্কে পাহাড়ি জনপদ
১৯৯৬ সালের দিকে শুরু হওয়া মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব এখন শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার মানুষের নিত্যদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই বন থেকে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল। ধান, শাকসবজি, কলাগাছ, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছ নষ্ট করে। গোলার ধান-চাল খেয়ে এবং পায়ে মাড়িয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। কখনো ভেঙে ফেলে বসতঘর, কখনো কেড়ে নেয় মানুষের প্রাণ।
হাতির ভয়ে অনেক কৃষক জমিতে ফসল আবাদ করতে চান না। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে চাষাবাদ করলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই হাতির পাল হানা দিয়ে তা নষ্ট করে দেয়। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে খাদ্য ও জীবিকার অনিশ্চয়তা। ধান কাটার মৌসুম সামনে রেখে সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
মানুষের নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নিরাপদ আবাসস্থল ও পর্যাপ্ত খাবারের সংকটে বিপন্ন হচ্ছে হাতির জীবনও। ফলে দীর্ঘদিনের এ সংকট মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোটি টাকার প্রকল্প, মাঠে সুফল কোথায়?
মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে ২০১৪ সালে তাওয়াকোচা ও বালিজুরি ফরেস্ট রেঞ্জ এলাকায় হাতির খাদ্য হিসেবে বাঁশ, কলাগাছসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা দৃশ্যমান নয়।
একই সময়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় স্থাপন করা হয় সোলার ফেন্সিং। অভিযোগ রয়েছে, স্থাপনের পর থেকেই এর বড় অংশ অকেজো পড়ে আছে। হাতির চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে নেওয়া এ উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজি মোহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অভয়ারণ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
হাতির আক্রমণ সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গঠন করা হয় ১০টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি)। প্রতিটি দলে রয়েছেন ১০ জন করে সদস্য। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলে ঝুঁকি নিয়ে গ্রামবাসীকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
হাতি তাড়ানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। মাঝেমধ্যে জেলা পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে টর্চলাইট বিতরণ করা হলেও দুর্গম এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবার এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
গোমড়া গ্রামের সখিনা বেগম, আকলিমা বেগম, আবুল কাশেম ও আনোয়ার হোসেন বলেন, তাঁরা হাতির চলাচল ও আক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করেন। তাঁদের ভাষ্য, ঘরে খাবার না থাকলেও প্রতি রাতে হাতি তাড়ানোর জন্য দুই লিটার কেরোসিন তেল ও টর্চলাইট হাতের কাছে রাখতে হয়। কিন্তু অনেকেরই সেই সামর্থ্য নেই। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও তাঁদের ভাগ্যে জোটে না।
প্রশ্ন উঠেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পগুলো নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় না থাকলে সেগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে কীভাবে? প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি ও ফলাফল মূল্যায়ন না হলে সংঘাত নিরসনের উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বনভূমি দখল, সংকট আরও গভীর
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন বিভাগের জমির পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার একর। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বেদখল বনভূমির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার একর। এসব জমিতে গড়ে উঠেছে শত শত ঘরবাড়ি; চলছে চাষাবাদ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বনভূমি দখল, হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতি মানুষ-হাতির সংঘাতের অন্যতম কারণ। হাতির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল ও পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা না করে শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
তাই বনভূমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগের পাশাপাশি বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের পুনর্বাসন, হাতির চলাচলের করিডর চিহ্নিতকরণ এবং আবাসস্থল সংরক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
তিন দশক পর অভয়ারণ্য ও খাদ্যভান্ডার গড়ার সিদ্ধান্ত
দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে হাতির অভয়ারণ্য ও স্থায়ী খাদ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আন্তদেশীয় হাতি চলাচলের করিডর গড়ে তোলার ঘোষণাও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময়সীমা, নির্ধারিত স্থান, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, আগের প্রকল্পগুলোর মতো নতুন উদ্যোগও বাস্তবায়নের অভাবে ব্যর্থ হলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে।
ঘোষণা নয়, এবার চাই দৃশ্যমান বাস্তবায়ন
স্থানীয়দের মতে, মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসনে এবার বিচ্ছিন্ন প্রকল্প কিংবা সাময়িক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হাতির নিরাপদ চলাচলের পথ ও আবাসস্থল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাদ্যভান্ডার গড়ে তোলা, অকেজো সোলার ফেন্সিং সচল করা এবং ইআরটি সদস্যদের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ও কার্যকর ক্ষতিপূরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। বন বিভাগের জমি দখল ও হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিন দশকের সংঘাতে ২৯ জন মানুষের মৃত্যু, ৩০টি হাতির প্রাণহানি এবং বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। শুধু সভা-সেমিনার কিংবা প্রকল্প গ্রহণ নয়, সফলতা নির্ভর করছে কার্যকর বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিক তদারকির ওপর।
এখন বড় প্রশ্ন—তিন দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে ঘোষিত অভয়ারণ্য ও আন্তদেশীয় করিডর কি সত্যিই বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি গারো পাহাড়ের মানুষকে আরও বহু বছর মৃত্যু, আতঙ্ক ও ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে বসবাস করতে হবে?

