রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ
কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর আর হিমেল হাওয়ায় জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আর এই আবহেই সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে শুরু হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছ পরিচর্যা ও প্রস্তুতের ধুম। শীতের মিষ্টি রস আস্বাদনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন গ্রামীণ জনপদের মানুষ। রস ও গুড় তৈরির প্রস্তুতিকে ঘিরে এখন দারুণ ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ও বহিরাগত গাছিরা।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ভোর হতেই দা, হাঁসুয়া ও দড়ি নিয়ে গাছে গাছে উঠে পড়ছেন গাছিরা। পুরোনো শুকনো ডালপালা ছাঁটাই ও গাছের উপরিভাগের নির্দিষ্ট অংশ চমৎকার দক্ষতায় চাছা-ছোলা (পরিষ্কার) করা হচ্ছে। কিছুদিন পর এই কাটা অংশে বাশের নোল বসানো হবে এবং ঝোলানো হবে মাটির ভাঁড় বা হাঁড়ি। শীত যত গাঢ় হবে, ফোটায় ফোটায় রস জমে পূর্ণ হবে মাটির পাত্র।
গ্রামবাংলার শীতকালীন সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে খেজুরের রসের ভূমিকা অপরিসীম। সুস্বাদু এ রস দিয়ে তৈরি হবে লালচে গুড় ও সুবাসিত পাটালি। শীতের সকালে খেজুরের রসে ভিজানো পিঠা-পায়েসের স্বাদ নিতে মুখিয়ে থাকেন রসিক বাঙালি। ফলে এই চার-পাঁচ মাস স্থানীয় বাজারে খেজুরের গুড়ের থাকে ব্যাপক চাহিদা, যা অনেক পরিবারের আয়ের মূল ভরসা।
তবে কালের পরিক্রমায় রায়গঞ্জে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে এই রূপসী ঐতিহ্য। বসতি বিস্তার, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং যত্রতত্র গাছ কেটে ফেলার কারণে খেজুরগাছের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। পাশাপাশি গাছে ওঠা-নামার ঝুঁকি ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কারণে নতুন প্রজন্ম এ পেশায় অনীহা প্রকাশ করছে।
গাছিদের ঘাটতি মেটাতে প্রতিবছরই এই মৌসুমে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রায়গঞ্জে ছোটেন মৌসুমী গাছিরা। স্থানীয় গাছের মালিকদের সঙ্গে লিজ বা নির্দিষ্ট চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তারা এলাকাভিত্তিক কাজ ভাগ করে নেন। পুরো শীত জুড়ে এখানেই আস্তানা গেড়ে রস সংগ্রহ ও গুড় জ্বাল দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এই শ্রমজীবী মানুষেরা।
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম জানান, “খেজুরগাছ শুধু আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ নয়, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এবং গ্রামীন অর্থনীতি সচল রাখতে নতুন করে খেজুরগাছ রোপণ ও পুরনো গাছগুলোর সঠিক যত্ন নেওয়া জরুরি।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, গ্রামবাংলার এই চিরায়ত রূপ ও গুড়ের পুষ্টির মান ধরে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ রোপণের সময় এসেছে।

